Skip to main content

সমসনের গল্প - Samson's Story

 সমসনের গল্প  - Samson's Story



ভূমিকা

সমসন ছিলেন প্রাচীন ইস্রায়েলের একজন বিচারক, যিনি তার অদ্ভুত শারীরিক শক্তি এবং ঈশ্বরের প্রতি আনুগত্যের জন্য বিখ্যাত। তিনি দান উপজাতির একজন ছিলেন এবং তার জন্মের পূর্বেই ঈশ্বর তাকে বিশেষভাবে নির্বাচিত করেছিলেন ইস্রায়েলকে ফিলিস্তিনীয়দের হাত থেকে মুক্ত করার জন্য। সমসনের জীবন এবং কার্যাবলি সম্পর্কে বিশদ বিবরণ দিয়ে এই গল্পটি আপনাদের সামনে উপস্থাপন করা হচ্ছে।

সমসনের জন্ম ও শৈশব

ইস্রায়েলীয়রা যখন ফিলিস্তিনীয়দের অত্যাচারে কষ্ট পাচ্ছিল, তখন ঈশ্বর একজন মুক্তিদাতা পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন। সমসনের বাবা মনোহ এবং মা দান উপজাতির সদস্য ছিলেন। সমসনের মা ছিলেন বন্ধ্যা, কিন্তু একদিন প্রভুর দূত তার কাছে এসে বললেন, "তুমি একটি পুত্র সন্তানের জন্ম দেবে এবং সে ইস্রায়েলকে ফিলিস্তিনীয়দের হাত থেকে মুক্ত করবে।"

সমসনের মা গর্ভাবস্থায় কোনও মদ্যপান বা অশুদ্ধ কিছু খেতে পারবেন না, এবং সমসন জন্মানোর পর তার চুল কখনো কাটানো হবে না, কারণ তিনি আজীবন নাজারাইট হবেন। এভাবেই সমসনের জন্ম হয় এবং তিনি বেড়ে ওঠেন ঈশ্বরের আশীর্বাদে।

সমসনের জন্মের পর, তার মা এবং বাবা তাকে ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করেন। সমসন বেড়ে ওঠার সময় তার অদ্ভুত শারীরিক শক্তির প্রকাশ ঘটে। এই শক্তি ঈশ্বরের আশীর্বাদ হিসেবে তাকে দেওয়া হয়েছিল, যাতে তিনি ইস্রায়েলকে ফিলিস্তিনীয়দের হাত থেকে মুক্ত করতে পারেন।

সমসনের অদ্ভুত শক্তি

সমসন বড় হওয়ার সাথে সাথে তার অদ্ভুত শারীরিক শক্তি প্রকাশ পেতে শুরু করে। একবার একটি সিংহ তাকে আক্রমণ করলে, সমসন নিজের হাত দিয়ে সিংহকে হত্যা করেন। এই ঘটনা তার শক্তির প্রথম প্রকাশ ছিল। এছাড়া, তিনি একবার এক হাজার ফিলিস্তিনীয়কে একাই হত্যা করেন শুধুমাত্র একটি গাধার চোয়াল দিয়ে।

তার শক্তি এবং সাহস ইস্রায়েলের লোকদের মধ্যে ঈশ্বরের শক্তির প্রমাণ ছিল। সমসন কখনোই তার চুল কাটতে দেননি, কারণ তিনি জানতেন তার শক্তি তার চুলের মধ্যে নিহিত।

ফিলিস্তিনীয়দের সাথে সমসনের যুদ্ধ

সমসনের জীবনের বেশিরভাগ অংশ ফিলিস্তিনীয়দের সাথে যুদ্ধ করে কাটে। তিনি অনেকবার ফিলিস্তিনীয়দের শিবিরে আক্রমণ করেন এবং তাদের সম্পত্তি ধ্বংস করেন। একবার তিনি গাজা শহরে প্রবেশ করেন এবং শহরের ফটক উপড়ে নিয়ে যান। এই ঘটনা ফিলিস্তিনীয়দের মধ্যে ভয় সৃষ্টি করে এবং তারা সমসনকে ধরার জন্য নানা পরিকল্পনা করে।

দালিলাহ এবং সমসনের পতন

সমসনের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল দালিলাহর সাথে তার সম্পর্ক। ফিলিস্তিনীয়রা সমসনের শক্তির গোপনীয়তা জানতে চেয়েছিল এবং দালিলাহকে ঘুষ দিয়ে সমসনের দুর্বলতা খুঁজে বের করতে পাঠায়। দালিলাহ সমসনকে তার শক্তির গোপনীয়তা জানাতে চাপ দেন। প্রথমে সমসন মিথ্যা তথ্য দেন, কিন্তু অবশেষে তিনি বলেন যে তার শক্তি তার চুলের মধ্যে নিহিত।

যখন সমসন ঘুমিয়ে পড়েন, তখন দালিলাহ তার চুল কেটে দেন এবং ফিলিস্তিনীয়রা তাকে ধরে নিয়ে যায়।

সমসনের প্রতিশোধ ও মৃত্যু

ফিলিস্তিনীয়রা সমসনের চোখ তুলে নেয় এবং তাকে বন্দী করে। একদিন, তারা একটি উৎসব আয়োজন করে এবং সমসনকে উপহাসের জন্য নিয়ে আসে। সমসন প্রভুর কাছে প্রার্থনা করেন তার শক্তি ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য, যাতে তিনি ফিলিস্তিনীয়দের ওপর প্রতিশোধ নিতে পারেন।

ঈশ্বর তার প্রার্থনা শুনে তাকে তার শক্তি ফিরিয়ে দেন। সমসন দুইটি প্রধান স্তম্ভ ধরে তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন, এবং ভবন ধসে পড়ে, সমসনসহ সব ফিলিস্তিনীয়রা মারা যায়।

সমসনের শিক্ষা

সমসনের জীবন আমাদের শেখায় যে ঈশ্বর আমাদের জন্য সবসময় একটি উদ্দেশ্য রেখেছেন, এবং আমরা আমাদের জীবনের ভুলগুলো সত্ত্বেও সেই উদ্দেশ্য পূরণ করতে পারি যদি আমরা ঈশ্বরের কাছে ফিরে যাই।

সমসনের বিশ্বাস ও সাহস আমাদের জন্য একটি শক্তিশালী উদাহরণ হিসেবে কাজ করে। তার জীবন ও কাজগুলি ঈশ্বরের পরিকল্পনার প্রতি আমাদের আস্থা স্থাপন করতে এবং আমাদের জীবনের প্রতিটি চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে অনুপ্রাণিত করে।

উপসংহার

সমসনের গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে ঈশ্বর আমাদের জীবনে সবসময় একটি লক্ষ্য রেখেছেন। আমরা যদি বিশ্বাস ও সাহস ধরে রাখি এবং ঈশ্বরের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভর করি, তবে আমরা যেকোনো প্রতিকূল পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে পারি।

সমসনের জীবন এবং তার নেতৃত্বে ইস্রায়েলের বিজয়ের গল্পটি আজও আমাদের অনুপ্রাণিত করে এবং আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে বিশ্বাস, সাহস এবং ঈশ্বরের প্রতি আমাদের সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ আমাদের জীবনে অসাধারণ পরিবর্তন আনতে পারে। সমসনের গল্পটি আমাদের শেখায় যে ঈশ্বরের সাথে সবকিছুই সম্ভব, এবং আমরা তাঁর ওপর বিশ্বাস রেখে এবং তাঁর পথ অনুসরণ করে আমাদের জীবনে মহান কিছু অর্জন করতে পারি।

Comments

Popular posts from this blog

গভীর বাইবেল অধ্যয়ন: মথির ৭:২৩-২৯ এর অর্থ বোঝা - MATHEW 7:23-29

  গভীর বাইবেল অধ্যয়ন: মথির ৭:২৩-২৯ এর অর্থ বোঝা ভূমিকা মথির ৭:২৩-২৯ যিশুর পর্বতদেশের উপদেশের সমাপ্তি হিসেবে গণ্য হয়, যেখানে তিনি খ্রিস্টীয় নৈতিকতা এবং আধ্যাত্মিক শৃঙ্খলার মৌলিক বিষয়গুলো তুলে ধরেছেন। এই অধ্যায়টি আমাদেরকে সতর্কতা দেয় এবং যিশুর শিক্ষার উপর ভিত্তি করে জীবন গড়ার আমন্ত্রণ জানায়। এই অধ্যয়নে আমরা এই শ্লোকগুলোর অর্থ, তাদের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এবং বিশ্বাসীদের জন্য তাদের প্রয়োগ নিয়ে আলোচনা করব। ১. প্রেক্ষাপটের পটভূমি এই শিক্ষাটি বোঝার জন্য যিশু যে প্রেক্ষাপটে এই উপদেশ প্রদান করেছিলেন তা জানা জরুরি। মথির ৫-৭ অধ্যায়ে অন্তর্ভুক্ত পর্বতদেশের উপদেশটি যিশুর মন্ত্রণালয়ের প্রথম দিকে, ইহুদিদের উদ্দেশ্যে প্রদত্ত ছিল। এই জনগণ মূসার আইন এবং ফারিসীদের শিক্ষার সাথে পরিচিত ছিল, যেখানে ধর্মীয় আচার-আচরণের বহিরাগত পালনকে গুরুত্ব দেওয়া হতো। কিন্তু যিশু এই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে একটি নতুন পথ নির্দেশ করেন, যা বাহ্যিক শৃঙ্খলার পরিবর্তে হৃদয়ের পরিবর্তনের উপর গুরুত্ব দেয়। ২. মথি ৭:২৩-২৯ এর ব্যাখ্যা এই অংশটি শ্লোক অনুযায়ী বিশ্লেষণ করা যাক: শ্লোক ২৩: “তখন আমি প্রকাশ্যে তাদের বলব, ‘আমি...

প্রেমের উপর একটি ধর্মোপদেশ -প্রেম - ঈশ্বরের সর্বোচ্চ আদেশ

 প্রেমের উপর একটি ধর্মোপদেশ বিষয়: প্রেম - ঈশ্বরের সর্বোচ্চ আদেশ বাইবেল রেফারেন্স: ১ করিন্থীয় ১৩:৪-৭; ১ যোহন ৪:৭-৮ প্রিয় ভাই ও বোনেরা, আজ আমরা ঈশ্বরের পবিত্র বাক্য থেকে প্রেমের বিষয়ে শিখব। প্রেম এমন একটি শক্তি, যা আমাদের জীবনকে পরিবর্তন করতে পারে, আমাদের সম্পর্ককে গঠন করতে পারে, এবং আমাদের হৃদয়ে ঈশ্বরের উপস্থিতি অনুভব করায়। প্রেমের মাধ্যমেই আমরা ঈশ্বরকে জানি এবং তাঁর সঙ্গে একাত্ম হতে পারি। প্রেমের প্রকৃতি পবিত্র বাইবেলে বলা হয়েছে, "প্রেম সহিষ্ণু এবং সদয়; প্রেম হিংসা করে না; প্রেম গর্ব করে না, দাম্ভিক হয় না; তা অসভ্য হয় না, স্বার্থপর হয় না, সহজেই রাগ করে না, এবং কোনো ভুলের হিসাব রাখে না। প্রেম অসত্যের আনন্দ পায় না, বরং সত্যের আনন্দে মুগ্ধ হয়। সবকিছু সহ্য করে, সবকিছুর বিশ্বাস রাখে, সবকিছু আশা করে, সবকিছু সহ্য করে।" (১ করিন্থীয় ১৩:৪-৭)। এই আয়াতগুলি আমাদের প্রেমের প্রকৃতি সম্পর্কে শিখায়। প্রকৃত প্রেম শুধুমাত্র অনুভূতি নয়; এটি ক্রিয়া। প্রেম মৃদু, সহনশীল, এবং বিনয়ী। এটি অন্যদের দোষ ধরে না এবং ঈর্ষা করে না। প্রেম সবকিছু সহ্য করে এবং সর্বদা আশা করে। প্রেমের উৎস প্রেম...

Ten Commandments

 বাইবেলে উল্লিখিত দশটি আদেশ (দশ আজ্ঞা) হল নৈতিক এবং আধ্যাত্মিক আচরণের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম। এই আদেশগুলো ঈশ্বর মূসাকে সিনাই পর্বতে প্রদান করেন এবং এগুলো বাইবেলের নির্বাণ অধ্যায় এবং দ্বিতীয় আইন গ্রন্থে লিপিবদ্ধ আছে। দশটি আদেশ (নির্গমন ২০:১-১৭): ১. "তুমি আমার ছাড়া অন্য কোন দেবতা রাখবে না।" একমাত্র সত্য ঈশ্বরের উপাসনা কর; তাঁকে ছাড়া অন্য কিছুকে ঈশ্বরের উপরে স্থান দিও না। ২. "তুমি নিজের জন্য কোনো মূর্তি বা প্রতিমা তৈরি করো না।" কোনো মূর্তি বা প্রতিমা তৈরি করে তার উপাসনা করো না, কারণ একমাত্র ঈশ্বরই উপাস্য। ৩. "তুমি তোমার ঈশ্বরের নাম কোনো অসৎ কাজে ব্যবহার করবে না।" ঈশ্বরের নামকে অসম্মানজনক বা অনুচিতভাবে ব্যবহার করো না। ৪. "বিশ্রামবার মনে রেখো, সেটিকে পবিত্র রাখো।" বিশ্রামবার (সপ্তম দিন) আলাদা করে বিশ্রাম ও উপাসনার জন্য রাখো। ৫. "তুমি তোমার পিতা-মাতাকে সম্মান করবে।" তোমার পিতা-মাতার প্রতি শ্রদ্ধা ও আনুগত্য প্রদর্শন করো। ৬. "তুমি হত্যা করো না।" অন্য কোনো ব্যক্তির জীবন অন্যায়ভাবে কেড়ে নিও না। ৭. "তুমি ব্যভিচার করো ...